সোনালী গুহ,যিনি এখন প্রায়ই সংবাদ শিরোনামে থাকেন । আবার তিনি শিরোনামে।
তাকে নিয়ে আগেও বলেছি,আজ আবার কিছু
কথা না বললেই নয়। সোনালী তৃনমূল ছেড়ে গেরুয়া শিবিরে যোগ দিলেও অন্দর মহলে কিন্তু
ঢুকতে পারেননি। এবার সেই অন্দর মহলে ঢোকার
প্রথম সিঁড়ি পেলেন সোনালী। বিজেপি তাকে রাজ্য মহিলা মোর্চার কর্ম সমিতির সদস্য করল।
দীর্ঘ দুবছর অপেক্ষার পর রাজনীতির দ্বীতিয়
ইনিংস খেলার জন্য মাঠে নামতে চাইছিলেন সোনালী । বিগত কিছু দিন ধরে সেই বার্তা দিয়েছেন বিজেপি নেতৃত্বকে।
তিনি দেখাও করেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি
সুকান্ত মজুমদারের সংগে। দেখা করার পর পরই
DA আন্দোলনকারীদের আন্দোলন মঞ্চে হাজির
হন শূভেন্দু অধিকারীর সংগে। আর মাঠে নেমেই
বাউন্সার মারতে শুরু করলেন সোনালি। আর তাতে অনেকেই হকচকিয়ে গেলেন।
সোনালী গুহ ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক সময়ের ছায়া সঙ্গী। তার যাতায়াত ছিল অন্দরমহল
পর্যন্ত; তাই তিনি মমতা সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতেন। সোনালী গুহ মমতার সংঘর্ষের দিনে তার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংঘর্ষ করেছেন। মমতাকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা হয়েছে, সেই সমস্ত দিনগুলিতে সোনালী কিন্তু সর্বসময় তার পাশেই ছিলেন।
সোনালী গুহ শুধু মমতার ছায়া সঙ্গী হয়েই ছিলেন না , তিনি তাঁর নিজস্ব একটা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও তৈরি করেছিলেন। তৃনমূলের উত্থান পর্বে
বামপন্থীদের গড় সাঁতরাগাছিতে ২০০১ সালে জয় ছিনিয়ে নেন সোনালী গুহ। এরপর এই সাঁতরাগাছি
থেকেই চারবার বিজয়ী হয়েছেন। এই সাঁতরাগাছি পাঁচ বার বিধায়ক হয়েছেন জ্যোতি বসু। ১৯৯৬ এর পর তিনি আর লড়েননি। ২০২১ এর বিধান সভায় টিকিট দেওয়া হলে হয়তো সোনালী গুহ ও এই রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলতেন। কিন্তু সোনালীকে টিকিটই
দিল না তৃনমূল। মমতা ব্যানার্জি হয়তো চায়নি সোনালী জ্যোতি বসুর বরাবরি করুক।
সোনালী গুহ খুবই অভিজ্ঞ এবং লড়াকু নেতৃ।
ভোটে জেতার কৌশল ছাড়াও সাধারণ মানুষের মধ্যে তার যথেষ্ট গ্রহনযোগ্যতা ছিল। এহেন সোনালীকে তখন টিকিট দেওয়া হল না তার কষ্ট
হতেই পারে, অভিমান হতেই পারে। তাই তিনি অভিমান বসে বিজেপিতে যোগ দিলেন। কিন্তু বিজেপি ও সোনালীকে টিকিট দিল না। দল তাকে
তেমনভাবে প্রচারের কাজেও লাগালো না।
নির্বাচনের পর দেখা গেল বিজেপি ক্ষমতায় আসতে পারল না। তৃনমূল বাম এবং কংগ্রেসকে
শূন্য করে দিয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে তৃতীয়
বার সরকার গড়ল। বিজেপি প্রথমবার বিধায় সভায় বিরোধী দল হিসেবে জায়গা করে নিল।
সোনালী গুহ কি ভেবেছিলেন জানিনা। কিন্তু আমার মনে হয় সোনালী গুহ এখানেই একটা ভূল করলেন। তিনি তৃনমূলে ফিরে গেলেন।
মমতা কিন্তু সোনালীকে কোন গুরুত্ব দিল না।
সোনালী গুহ মমতার সঙ্গে ছায়ার মত থেকেও কিন্তু মমতাকে চিনতে পারেননি। মমতার মধ্যে যে
একটা ক্ষমতার দম্ভ কাজ করছে সোনালী গুহ তার
অনুভব করতে পারেননি। মমতা অতন্ত সুকৌশলে তার পূরন দিনের সাথী এবং তাঁর সম্পর্কে যারা সবকিছু জানে তাদের সরিয়ে দিয়েছেন। সোনালী কেও তাই চাইছিলেন, টিকিট না দেওয়া ছিল তার
প্রথম ধাপ, বাকিটা সোনালী পূর্ণ করে দিল বিজেপিতে গিয়ে। তাই দলে ফিরে কান্নাকাটি করলেও মমতা ব্যানার্জি কোন গুরুত্ব দিলেন না।
সোনালী গুহ রাজনীতির লোক। সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে তিনি তার রাজনৈতিক ইমেজ গড়ে তুলেছিলেন। দুবছর বসেছিলেন। কেউ তাকে ডাকেনি। কিন্তু সোনালী নিজেকে এভাবে হারিয়ে যেতে দিতে পারেন না। তিনি তৈরি হচ্ছিলেন রাজনীতির দ্বীতিয় ইনিংস খেলার জন্য। তিনি রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করেছেন তার পর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিজেপিতে যোগ দেবার।
সোনালী বুঝেছিলেন রাজনীতির দ্বীতিয় ইনিংসটা তাকে অন্যভাবে খেলতে হবে। তাই মাঠে নেমেই বাউন্সার মারলেন। বুঝিয়ে দিলেন নিজের অস্তিত্ব। সোনালী জানতেন এটা সকলের ভালো নাও লাগতে পারে। এবার তিনি সংযত। তিনি যে সিঁড়িটা খুঁজছিলেন তার প্রথম ধাপে পা রাখলেন।
মে মাসের প্রথম সপ্তাহে সতীর্থ সজল ঘোষকে সংগে নিয়ে সুকান্ত মজুমদারের সংগে দেখা করেন
সোনালী। তিনি বিজেপির সংগে কাজ করার আর্জি জানান। এর পরেও বিজেপির মধ্যে দ্বিধা ছিল। কেননা সাম্প্রতিককালে সোনালী যেভাবে ব্যক্তিগত আক্রমন শানাচ্ছেন তা দলের পক্ষে ভাল হবে কিনা তা নিয়ে দ্বিমত ছিল।
বিজেপি শেষ পর্যন্ত স্থির করে মূল দলে না রেখে মহিলা মোর্চা'য় জায়গা দেওয়া হবে। এটা তাকে এরকম অবর্জারভেশনে রাখা হল, কিছু দিন তার কাজ দেখার পর তাকে কোন্ পদ দেওয়া যায় তা বিবেচনা করবে দল। এটা সোনালী গুহর জন্য ভালই হল। এতে তিনি শাখা সংগঠনকে যেমন বুঝতে পারবেন, তেমনি নীচু তলার কর্মী সমর্থকদের সঙ্গে একটা সংযোগ তৈরি করতে পারবেন। সবচেয়ে বড় কথা তিনি নিজেকে বিজেপির সর্বস্তরে সম্পৃক্ত করার সুযোগ পাবেন।
সোনালী গুহর এই নতুন পদ পাওয়ার পরে আনন্দবাজার তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন এখন কোন প্রতিক্রিয়া নয়। দল যেভাবে কাজ করতে বলবে তেমনি ভাবেই করব। এবার নেতৃত্বের কাছে জেনে নেব ঠিক কিভাবে আমাকে কাজ করতে হবে।
গত শনিবার বিজেপির মহিলা মোর্চার রাজ্য সভানেত্রী বদল হয়েছে। তনুজা চক্রবর্তীর স্থলে
নতুন সভানেত্রী ফাল্গুনী পাত্র। মহিলা মোর্চার সাংগঠনিক দায়িত্ব ও বদল হয়েছে। শনিবার গঠিত হয় মোর্চার ১২১ জনে রাজ্যকর্ম সমিতি। তাতেই জায়গা পেয়েছেন সোনালী গুহ।
সাধারণত বিজেপি রাজ্য কর্মসমিতির সদস্যদের তার নিজের জেলাতেই দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিজেপির সাংগঠনিক জেলা ডায়মন্ডহারবারের বাসিন্দা সোনালী গুহ। সেটাই তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মহিলা মোর্চার নতুন সভানেত্রী সোনালী গুহ সম্পর্কে বলেন, উনি অনেক দিন থেকেই কাজ করতে চাইছিলেন, শুরুতে ওনাকে নিজের জেলাতেই কিভাবে কাজে লাগানো যায় সেটা দেখা হচ্ছে। একই সংগে ফাল্গুনী উল্লেখ করেন
উনি দীর্ঘদিন বিধায়ক ছিলেন। ফলে ওনার অনেক অভিজ্ঞতা। দল অবশ্যই চাইবে সোনালী গুহর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে। এবার দেখার বিষয় হল সোনালী তার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দলকে এবং নিজেকে কতটা সফল করে তোলেন।

No comments:
Post a Comment